এবং বিদ্যাসাগর: কয়েকটি কথা
বিদ্যাসাগর ও তৎকালীন বঙ্গসমাজের প্রতি আমার আগ্রহ অপরিসীম। যখন যেখানে যা পেয়েছি পড়ার চেষ্টা করেছি। এখনও করছি। ব্স্তুত উনিশ শতকের সেই সময়কে বোঝা অনেক কারণেই জরূরী। অনেকেই এটিকে বলে বাংলার নবজাগরণ, কিংবা রেনেশাঁশ। রেনেশাঁস বা নবজাগরণ হোক আর নাই হোক সেটি একটি যুগসন্ধিক্ষণ। ইংরেজদের আগমণ- তাদের শাসন - তার মধ্যে হিন্দুসমাজের বেড়ে ওঠা - রাজা রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসুদন দত্তের মতো মহাত্মাদের আগমণ - সব মিলিয়ে ভিন্ন এক সময়। সামন্তবাদের উপর পা দিয়ে এগিয়ে আসছে পুঁজাবাদের নূতন সময়।
২.
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও তাঁর সময় সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের বারবার ফিরে যেতে হয় বিনয় ঘোষের কাছে। তারপর মাইকেল মধুসুদন দত্তের জীবনি পড়তে গিয়েও আমরা স্তব্ধ হয়ে যাই - 'আশার ছলনে ভুলি' পড়ে গোলাম মুরশিদকে নমস্কার জানাই। আবার বিশাল দুই খন্ডে দেখতে পাই সুনীল গঙ্গোপ্যাধ্যায়ের 'সেই সময়'। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেসব পড়তে থাকি।
৩.
এবং বিদ্যাসাগর মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে দেখে সেটির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি। আমাদের অনেকেরই প্রিয় মামুনুর রশীদ। তাঁরই বদান্যতায় 'এবং বিদ্যাসাগর' নাটকের উদ্বোধনী মঞ্চায়ন দেখার সযোগ হয়, সপরিবারে। সেখানে গিয়ে আমাদের সুস্কৃতি অঙ্গনের অনেকের সাক্ষাৎ পাই। আমি ধন্য, এসবের জন্য।
৪.
উদ্বোধনী মঞ্চায়নের শুরুতেই বক্তব্য রাখেন ড. বদরুদ্দীন উমর। তাঁর পরিচয় ভিন্নভাবে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। একসময় তাঁর ভক্ত ছিলাম; তাঁর কথাকে আমি - এবং আমার অনেক বন্ধুই - বেদবাক্য বলে মনে করতাম। অনেকেই তাঁকে বিশিষ্ট বামপন্থী চান্তাবিদ, কিংবা বিপ্লবী চিন্তাবিদ, তাত্ত্বিক, ইত্যাদি নামে অভিহিত করে থাকেন। তিনি বক্তব্য রাখতে গিয়ে যা বললেন তার সারমর্ম হলো - আগের দিনে অনেক ভাল নাটক হতো, এখন তা হয় না (যদিও তিনি এও বলেছেন যে এখন টিভিতে অনেক নাটক হয় কিন্তু তিনি সেসব দেখেন না বা দেখা সম্ভব হয় না)। এই বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত নাটকে কী আছে তাও তিনি জানেন না। তবে আশা করেন যে এরকম একটি নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে আরণ্যক একটি ভাল কাজ করছে - লোকজন অন্তত বিদ্যাসাগরের নাম জানতে পারবেন। কথাগুলি শুনে তাত্ত্বিকের মতোই মনে হলো। কয়েকটি প্রশ্ন দেখা দিল মনে:
ক. নাটকটি কী বিষয়ে সেটি না দেখে কেন উদ্বোধনী বক্তব্য দিতে তিনি এলেন?
খ. এখনকার নাটক দেখার সময় যদি তাঁর নাই হয় তাহলে তিনি কেন মন্তব্য করলেন যে আগের দিনে অনেক ভাল নাটক হতো, এখন তা হচ্ছে না।
গ. ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম কয়জন নামে সে ব্যাপারে তিনি যে সন্দেহ পোষণ করেছেন তা কি তাঁর পান্ডিত্যের জন্যই?
ঘ. আরণ্যক নাট্যগোষ্ঠী কেন তাঁকেই বেছে নিলেন বক্তব্য দেয়ার জন্য - যে কিনা এখনকার নাটক দেখেন না এবং যে নাটকের উদ্বোধনী বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন সেটি সম্পর্কেও বিশেষ কিছু জানেন না?
এসবের উত্তর হয়ত জানা হবে না। তবে তাঁর বক্তব্য শুনে বহুদিন আগে আরেক বামপন্থী নেতা মনজুরুল আহসান খানের একটি কথা মনে পড়ে গেল: 'বামপন্থীদের বুদ্ধি বেশি, আক্কেল কম।'
৫.
মঞ্চের পর্দা উন্মোচিত হলো। নাটক শুরু হলো। রাতের কলকাতা। বারবণিতা। এক জমিদারের মাতলামি। দৃশ্য ও অভিনয় ভালই। তারপর অন্যান্য দৃশ্য। মূলত কয়েকটি চরিত্র: বারবণিতা নীলমনি, মহারাম বাচস্পতি - জমিদার, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসুদন দত্ত, এবং স্কুল শিক্ষিকা মহিমা দেবী। এর মাঝে ইয়ং বেঙ্গলদের মাতলামিও আছে। আছে তৎকালীন গোঁড়া হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া। সবশেষে দেখতে পাই অসহায় বিদ্যাসাগর। প্রশ্নবিদ্ধ তিনি। আসলেই কি তিনি ঠিক কাজটি করছেন? বিধবাদের বিয়ে দিয়ে তিনি কার মঙ্গল করছেন? লম্পটদের লাম্পট্য চরিতার্থ করতে সাহায্য করছেন? নাকি সধবাদের সংসার ভেঙে দিচ্ছেন সতীন জুটিয়ে দিয়ে? তারই পাশে মধুসুদন দত্ত। রাধাকান্ত বিলেত পাড়ি দিয়েছেন বিদ্যাসাগরকে না জানিয়েই, মাইকেল এসেছেন জানাতে - তিনিও যাচ্ছেন বিলেত। তিনি সম্ভবত এসেছেন এই কারণে যে বিদ্যাসাগরের নিকট থেকে আরো কিছু টাকা নেয়া দরকার!
৬.
বিদ্যাসাগর ও তাঁর সময়কালকে এই দুই ঘণ্টার নাটকে ফিটিয়ে খুবই কঠিন সন্দেহ নেই। তারপরও নাটকটি দেখতে গিয়ে মনে হয়েছে সেটিকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তোলা যেতে বিদ্যাসাগরের প্রতি আরো বেশি আলোকপাত করে। নাটকটি দেখতে গিয়ে একসময় মনে হয়েছে নাটকের বিষয় বিদ্যাসাগর নয় - সেই সময়ের বেশ্যাবৃত্তি ও জমিদার শ্রেণীর বেপরোয়া জীবনযাপন। আবার একসময় মনে হয়েছে নাটকটি মাইকেলকে নিয়ে। আবার মনে হয়েছ এটি বিধবা বিবাহ বিষয়ক নাটক। সন্দেহ নেই যে বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ বিষয়ে অণেক কাজ করেছেন। কিন্তু সেটিই তাঁর একমাত্র কাজ নয়। সমাজ সংস্কারক হিসেবে তিনি আরো কিছু করছেন। সেগুলিও উঠে আসলে ভাল লাগত। আর বেশ্যাদের নিয়ে যে নাটকীয়তা আনা হয়েছে তাও আরো বাস্তবসম্মত করা যেতে।
৭.
নাটক দেখার পর একজন আমাকে বললেন, শিল্পকে হওয়া দরকার বস্তুনিষ্ঠ। বস্তুনিষ্ঠ বলতে তিনি কী বোঝাতে চেয়েছেন তিনিই জানেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে শিল্পীর স্বাধীনতাই আমি বিশ্বাসী। শিল্পী যা দেখেন, যেভাবে দেখেন তাই সত্য, তাঁর কাছে। তবে তিনি যা তুলে ধরছেন তা শৈল্পিক কি না সেটির প্রতি আমার দৃষ্টি থাকবে সবসময়। কেউ এই জগৎটাকে দেখে বাঁকাভাবে - মন্দটাই তাদের নিকট প্রকট হয়ে ওঠে। আবার কারো চোখে সৌন্দর্যটাই ধরা পড়ে আগে। কোনোটাই ভাল নয়, মন্দও নয়। কীভাবে সেটি উপস্থাপন করছে সেটিই বড়। এ নাটকের নাট্যকার মন্দকে তুলে ধরতে পছন্দ করেন, এবং এও মনে করেন এসব মন্দকে দূর করা দরকার। আর যাঁরা নাটকটি করছেন তাঁদের শোল্গান হলো নাটক হোক সমাজ বদলের হাতিয়ার! জানি না সেটি আদৌ কখনো হবে কি না।
৮.
নাটকটি দেখতে গিয়েছিলাম সপরিবারে। আবার তের বছরের ছেলে ছিল সঙ্গে। বেরিয়ে আসার পর রাস্তায় জিজ্ঞেস করছিল, বাবা, বিদ্যাসাগর কেন বিধবা বিবাহ দিচ্ছিলেন? আমি জানি না, তার মনে গেঁথে গেছে কি না যে বিদ্যাসাগরের অবদান কেবল বিধবা বিবাহ দেয়া, আর মাইকেল মানেই মদ্যপান!
৯.
নাটকটি আমাকে আলোড়িত করেছে। আবারও সেই সময়কে জানার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে। ফিরে এসেই গোলাম মুরশিদের লেখায় মন দিয়েছি, এবং পরের দিনই তাঁর লেখা ছোট-বড় সবার মাইকেল বইটি শেষ করেছি। বলতে দ্বিধা নেই, মাইকেল সম্পর্কে এত কিছু জানতমা না। আর এই নাটকটি না দেখলে সেই আগ্রহ জন্মাত কি না কে জানে। তাই বলব, নাটকটি সার্থক - সমাজ বদলাতে না পারলেও জানার আগ্রহ জাগিয়ে দেয়ার জন্য। সবার প্রতি আবেদন, পারলে একবার দেখবেন।


